ইসলামী ইতিহাসে মহামারী:
এমন এক মহামারীর মুখোমুখী হয়েছিলো হিজরী আঠারো শতকের শুরুর দিকে রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে আসা মুসলিম মুজাহিদগণ; যার সেনাপতি ছিলেন এ উম্মতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মহামানব বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযি.। যুদ্ধে মুজাহিদীনদের উৎসাহদানের লক্ষ্যে শামের উদ্দেশ্যে কাফেলাসহ আসছিলেন আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.। সার্গ প্রান্তর পর্যন্ত এসে উপনিত হলে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এগিয়ে আসলেন শাম হতে হযরত আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযি. ও আসপাশের জিহাদরত কাফেলা হতে হযরত মুআয বিন জাবাল ও আমর ইবনুল আস রাযি. প্রমূখ সাহাবাগণ।
কেউ হযরত ওমরকে শাম দেশে না যেতে পরামর্শ দিলো। কারণ ওখানে মহামারী প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। তাই তারা আমীরুল মুমিনীন মদীনায় ফিরে গেলেই ভালো হবে বিবেচনা করে তাকে এমন পরামর্শ দিলেন। আর কেউ তাকে তার সফরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে শামের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য উৎসাহিত করলো। অতপর হযরত ওমর বিন খাত্তাব রাযি. এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য প্রথমে আহবান করলেন বিশিষ্ট মুহাজির সাহাবাগণকে। অতপর তাদের বিদায় দিয়ে ডাকলেন বিশিষ্ট আনাসারগণকে। তাদের সকলে তাকে পূর্ববৎ মিশ্র পরামর্শ দিলো। অতপর তিনি বিশিষ্ট কোরাইশী সাহাবীদের ডেকে পরামর্শ কামনা করলে তারা সকলে অবশিষ্ট সাহাবীদের নিয়ে আমীরুল মুমিনীন মদীনায় ফিরে যাওয়া মুনাসেব হবে বিবেচনা করলেন এবং এ মর্মে তাকে পরামর্শ দিলেন। ইত্যবসরে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল আওফ রাযি. শুনালেন মহানবী স. এর এ প্রাসঙ্গিক হাদীসখানি। তিনি বলেন রাসূল স. বলেছেন যদি কোথাও মহামারির কথা জানতে পারো তবে তুমি সেখানে যেওনা; আর যদি তোমার অবস্থানস্থলেই মহামারি বিস্তার লাভ করে তবে তুমি সেস্থান ত্যাগ করোনা।
আল্লাহর নবীর হাদীসই চূড়ান্ত ফায়সালা দিলো। সিদ্ধান্ত হল আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফিরে যাবেন মদীনায় এবং মুজাহিদ কাফেলা যারা জিহাদরত ছিলেন তারা জিহাদের ময়দানে ফিরে যাবেন।
হযরত আবূ উবাইদা রাযি. বিষয়টিকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী ভাবলেন; এবং মনে করলেন “তকদীরে যা চূড়ান্ত আছে; অবশেষে তাইতো ঘটবে; মৃত্যু হতে পলায়ন করেতো মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচা যাবেনা। তাই তিনি হযরত ওমর রাযি. কে বলেই বসলেন: আ ফেরারুন মিন কাদারিল্লাহ ? তবে কি আপনারা আল্লাহর তকদীর হতে পলায়ন করছেন ? । এহেন সময় হযরত আবূ উবাইদার মত বিজ্ঞ ব্যক্তি এমন একটি মন্তব্য করে বসবে; এরুপ পরিস্থিতির জন্য হয়তো হযরত ওমর প্রস্তুত ছিলেন না; তাই তিনি প্রত্যুত্তরে বল্লেন; হে আবূ উবাইদা ! কথাটি তুমি না বলে যদি অন্য কেউ বলতো হয়ত সারা যেতো কিন্তু তুমি আমাদের বিষয়ে এমন মন্তব্য কিভাবে করলে ! অতপর আবূ উবাইদার কথার প্রকৃত উত্তর তিনি দিলেন , বল্লেন ; হাঁ আমরা আল্লাহর এক তকদীর হতে তার আরেক তকদীরের দিকে পলায়ন করছি।
হযরত ওমর রাযি. মদীনায় ফিরে গেলেন ; আর সেনাপতি হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি. মুজাহিদীনদের নিয়ে শামের ময়দানে চলে গেলেন।
বাইতুর মাকদিসের পাশে এক জনবসতির নাম ছিল ‘আমওয়াস’ সে এলাকাজুড়ে প্লেগ মহামারীর আকার ধারন করেছিল; ইতিমধ্যে বিভিন্ন মুসলিম যোদ্ধাগণ প্লেগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছিল; অবশেষে হযরত আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযি. প্লেগাক্রান্ত হন।
মদীনায় ফিরে হযরত ওমর আবূ উবাইদা রাযি. কে নিয়ো ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন; হায় যদি আবূ উবাইদার কিছু হয়ে যায় ! অথচ সে সময় ইসলামের দিগবিজয়ের প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন হযরত আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযি. । আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর হযরত আবূ উবাইদাকে এতটাই চাইতেন এবং ইসলামের বিজয়ের ধারাবাহিকতায় এতটাই তার প্রয়োজন অনুভব করতেন যে. একদা কোন ঘরে বসে উপুস্থিত ব্যক্তিদের বল্লেন, তোমরা কে কি বাসনা করো? কার কি আশা ? কেউ বল্ল আমার যদি এ পরিমাণ টাকা পয়সা হতো তবে আমি আল্লাহর রাস্তায় দান করতাম! ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্নজন বিভিন্ন মনবাসনার অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো। এবার কেউ জিজ্ঞাসা করলো; আমীরুল মুমিনীন কি আশা পোষণ করতেন ! তিনি বল্লেন; আমি চাইতাম যদি এ ঘর ভর্তি আবূ উবাইদার মত মানুষ দিয়ে ভরে যেতো আর আমি দিকবিজয় করে ইসলামী রাষ্ট্র্র্ এর স্বীমানা বাড়িয়ে চলতাম। তাই তিনি আবূ উবাইদাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনার জন্য পত্র লিখে পাঠালেন যে, আমার তোমাকে খুব প্রয়োজন , সুতরাং যদি পত্র রাতের বেলায় পৌছে তুমি প্রভাত হওয়ার আগে আর যদি চিঠি দিনে পৌছে তবে তুমি রাত হওয়ার আগেই শাম ছেড়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবে।
পত্র হাতে পৌছতেই আবূ উবাইদার বুঝতে বাকি রইলনা যে আমীরুল মুমিনীন তাকে কেন জরুরী তলব করেছেন; তিনি প্রত্যুত্তর পাঠালেন; আমিরুল মুমিনীন ! আমি মুসলমান মুজাহিদদের মাঝে আছি; এদের ছেড়ে আমি চলে যেতে পারিনা বরং আল্লাহ পাক আমার বিষয়ে যা ভালো তাই করুন; আপনি আমাকে বরং এখানেই থাকার অনুমতি প্রদান করুন।
হযরত ওমর উত্তর পেয়ে এতখানি ক্রন্দন করলেন যে, লোকেরা জিজ্ঞাসা করতে লাগলো তবে তিনি আবূ উবাইদা মারা গেছেন ! হযরত ওমর বল্লেন; না মারা যায়নি তবে তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।
কিছুদিন পর হযরত আবূ উবাইদা রাযি. প্লেগে আক্রান্ত হলেন এবং মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে উপনিত হলেন; মৃত্যুর পূর্বে তিনি উপুস্থিত মুজাহিদীনকে উদ্দেশ্য করে অমূল্য ভাষন দান করেন; অতপর মৃত্যুর ক্রোড়ে ঢলে পড়েন। তিনি সেনাপতি হিসেবে হযরত মুআয ইবনুল জাবাল রাযি.কে নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন; হযরত মুআয বেশ কিছুদিন সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন; প্লেগ মহামারীর আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এমতাবস্থায় হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. প্লেগকে আগুনের সাথে উপমা দিয়ে বলেন এটা যেন কোন রোগ নয় বরং আগুন; আমাদের জন্য এতদ অঞ্চল ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া উচিৎ । এতে হযরত মুআয দারুন মর্মাহত হন এবং সকলের উদ্দেশ্যে এক ভাষনে তিনি হযরত আমর ইবনুল আসের নিন্দা করেন অতপর সকলকে খেতাব করে বলেন : ভায়েরা সবাই , এটা মহান আল্লাহর রহমতবিশেষ। এবং তোমাদের নবীজির দোয়া। মহান আল্লাহ যেন মুআযের পরিবারকেও এর অংশ দান করেন। ফলে হযরত মুআযের পরিবারও প্লেগে আক্রান্ত হলেন ; তার উভয় স্ত্রী এতে মৃত্যু বরণ করলেন এবং তার ছেলে আব্দুর রহমানও আক্রান্ত হলেন; অবশেষে হযরত মুআযও প্লেগাক্রান্ত হয়ে তার পরিবার সদস্যগণ এই নশ্বর র্পৃথীবিকে বিদায় জানিয়ে পরম মাওলার সান্নিধ্যে চলে গেলেন। (রাহিমাহুল্লাহুম রামামাতান ওয়াসিয়ান।) এরপর সেনাপতির দায়িত্বভার আসলো বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. এর উপর । তিনি বিষয়টি সমাধান আবিষ্কার করলেন; তিনি সকলকে বল্লেন; হে মুসলমান এটি এমন এক রোগ যা; আগুনের মত বিস্তার লাভ করে; সুতরাং তোমরা এ আক্রান্ত এলকা ত্যাগ কর এবং ছোট ছোট দলে পাহাড়ে আশ্রয় নাও। সাহাবা ও মুসলমান সৈন্যগণ তাই করলো ।
সূত্র হাদীস: মুসনাদে আহমদ : 17089, 21075, 21078, 21123,
- Morning Shift07:30:00-01:00:00
- Day Shift08:00:00-12:30:00
Our Shift
Online Admission
Admission going on
Get admission from complete digital institute
Our institute are ready to serve you.
